লিওনেল আন্দ্রেস মেসি
Football Hero Lionel Messi
ফুটবাল
মানে লিওনেল মেসি, মেসি মানেই যেন ফুটবল। মেসির নাম শুনলেই সারাবিশ্বের ফুটবল প্রেমিদের
মনে একটা অন্যরকম অনুভুতি কাজ করে। চলুন আজকে জেনে নেই ভিন্ন গ্রহের এই ফুটবলার লিওনেল
মেসি সম্পর্কে খুটিনাটি সকল তথ্য। লিওনেল
আন্দ্রেস “লিও” মেসি একজন আর্জেন্টাইন পেশাদার ফুটবল খেলোয়াড় যিনি ফরাসী পেশাদার
লিগের শীর্ষস্তর লিগ ১ এর ক্লাব পারি সাঁ-জেরমাঁ এবং আর্জেন্টিনার জাতীয় ফুটবল দলের
হয়ে একজন আক্রমণভাগের খেলোয়াড় হিসেবে খেলেন। তিনি বর্তমানে আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের
অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
লিওনেল মেসির জন্ম ও শৈশবের জানা অজানা নানা তথ্য
বিশ্ব
ফুটবলের অন্যতম সেরা তারকা লিওনেল মেসি। শুধু মাঠেই নয়, ব্যক্তিগত জীবনেও ভারসাম্য
অনবদ্য। তা বলার অপেক্ষা রাখে না। লং ডিসট্যান্স রিলেশনশিপ টিকিয়ে ৪ বছরের বিবাহিত
জীবন এখন তাঁদের।ছেলেবেলায় আর্জেন্টিনাতেই দেখা হয় মেসি এবং আন্তোনেলার। তাঁরা দুজনেই
আর্জেন্টিনার রোজারিওর বাসিন্দা। দূরে থেকেও প্রেম কিন্তু কমেনি। উল্টে বেড়েছে। জীবনের
নানান চড়াই উতরাইতে মেসির ছায়া হয়ে থেকেছেন তাঁর স্ত্রী আন্তোনেলা রোকুজো। আন্তোনেলা
পেশায় ব্যবসায়ী। তিনি মডেলিংও করেন। একই সঙ্গে সামলান সংসার ও সন্তানদের। তিন সন্তান
মাতেও, সিরো ও থিয়াগোকে নিয়ে তাঁদের সুখের সংসার এখন।
মেসি কোন ধর্ম পালন করেন?
মেসির
ধর্ম কোনটি ? বর্তমান পৃথিবীর সেরা ফুটবলার লিওনেল
মেসি। তিনি জন্মসূত্রে ল্যাটিন আমেরিকার দেশ
আর্জেন্টিনার নাগরিক। ল্যাটিন আমেরিকার অন্য
সকল দেশের মতোই আর্জেন্টিনাতেও খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীর লোক সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। আর্জেন্টিনার ৭১% জনগণের ধর্মের অনুসারী এবং তাদের দেশে ক্যাথলিক খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী
সবচেয়ে বেশি। তারা ক্যাথলিক খ্রিস্টধর্ম খুবই বেশি চর্চা করেন। যদিও মেসি তার নিজের মুখে সরাসরি কিছু বলেননি তবে
তিনি ক্যাথলিক খ্রিস্টান ধর্মের অনুসারী।
তার আচার-আচরণ দেখে বুঝা যায় যে তিনি খ্রিস্ট ধর্ম
অনুসরণ করেন। আপনারা যদি একটু ভালোভাবে খেয়াল করেন তাহলে দেখতে পাবেন যে মেসি যখন
গোল করে তখন তার দুই হাতের আঙ্গুল দিয়ে ক্রস চিহ্ন তৈরি করে। সে ক্রস তৈরি করে আঙ্গুলগুলো আকাশের দিকে তাক করে রাখে। তিনি উল্লেখ করেছেন
তিনি তার দাদির কৃতজ্ঞতাস্বরূপ এটি করেন। এছাড়াও আমরা জানি আঙ্গুল দিয়ে করছিনা
তৈরি করা কিংবা আকাশের দিকে তাক করে রাখা কাজকর্মগুলো খ্রিস্ট ধর্মের লোকেরা
সবচেয়ে বেশি করে থাকে।
মেসির ফুটবল জীবন শুরু
মাত্র
পাঁচ বছর বয়সে মেসি স্থানীয় ক্লাব গ্রান্দোলির হয়ে ফুটবল খেলা শুরু করেন যার কোচ
ছিলেন তার বাবা হোর্হে। ১৯৯৫ সালে মেসি রোজারিও ভিত্তিক ক্লাব নিওয়েল’স ওল্ড বয়েজে
যোগ দেন। একই সময় মেসি একটি স্থানীয় যুব শক্তিক্লাবের সদস্য হয়ে পড়েছিল যার ফলে এই
ক্লাবটি পরবর্তী চার বছরে একটি মাত্র খেলায় পরাজিত হয়েছিল এবং স্থানীয়ভাবে মেসি
“দ্য মেশিন অফ ‘৮৭” নামে পরিচিত হয়ে উঠেছিল। তাকে “দ্য মেশিন অফ ‘৮৭” নামে ডাকার কারণটাও মজার। কারণ সেই
সময় বিশেষভাবে পরিচিত হয়ে ওঠা সবাইকেই তাদের জন্মসাল (১৯৮৭) সহ নাম দেয়া হত।
গ্রোথ হরমোনের সমস্যায় মেসির ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত
লিওনেল মেসির ছোটবেলা থেকেই ফুটবলের প্রতি ছিল অসম্ভব টান। যার কারণে তিনি
অল্পদিনের মধ্যেই ফুটবলে অনেক ভালো একটি অবস্থান তৈরি করেন এবং খুব সহজেই স্থানীয় ভাবে
ব্যাপক পরিচিত লাভ করে। কিন্তু মাত্র ১১ বছর বয়সে মেসির গ্রোথ হরমোনের সমস্যা ধরা
পড়ে। তার চিকিৎসার জন্য অনেক টাকার প্রয়োজন ছিল। যার পরিমাণ ছিল প্রতি মাসে ৯০০ মার্কিন
ডলার। স্থানীয় ক্লাব রিভার প্লেট মেসির প্রতি তাদের আগ্রহ দেখালেও সেসময় মেসির চিকিৎসার
খরচ বহন করা তাদের পক্ষে সম্ভব ছিলনা। যার ফলে মেসির ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
বার্সেলোনায় মেসির নতুন জীবন শুরু
গ্রোথ
হরমোনের সমস্যায় মেসির ভবিষ্যৎ যখন অনিশ্চিত ঠিক তখই বার্সেলোনার তৎকালীন ক্রীড়া পরিচালক
কার্লেস রেক্সাচ মেসির পাশে এসে দাড়ায়। কারণ ইতিমধ্যে তিনি মেসির প্রতিভা সম্পর্কে
জানতে পেরেছিলেন এবং তার খেলা দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন। মেসির সাথে চুক্তির সময় হাতের কাছে
কোন কাগজ না পেয়ে একটি ন্যাপকিন পেপারে তিনি মেসির বাবার সাথে চুক্তি সাক্ষর করেন।
একারণে এই চুক্তি “ন্যাপকিন পেপার চুক্তি” হিসেবেও পরিচিত। এই চুক্তি মাধ্যমে মেসি
বার্সেলোনায় তার খেলোয়াড় জীবন শুরু করেন। মেসির চিকিৎসার সমস্ত ব্যয়ভার বহন করতে রাজী
হয় বার্সেলোনা। এরপর মেসি এবং তার বাবা বার্সেলোনায় পাড়ি জমান। সেখানে মেসি বার্সেলোনার
যুব একাডেমী লা মাসিয়াতে যোগ দিয়ে নতুন উদ্দীপনায় আবার তার খেলোয়াড় জীবন শুরু করে।
বার্সেলোনা ক্লাবে মেসির পথচলা
মেসি
২০০০ সালে থেকে বার্সেলোনার যুব একাডেমীর ইনফান্তিল বি, কাদেতে বি এবং কাদেতে এ দলে
খেলেছেন। কাদেতে এ দলে খেলার সময় তিনি ৩৭
গোল করেন। ২০০৩ সালে অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার কারণে তাকে ক্লাব থেকে প্রায় ছেড়েই দেওয়া
হয়েছিল কিন্তু যুব দলের প্রশিক্ষণ কর্মীদের জোড়াজুড়িতে ক্লাবের ব্যবস্থাপনা পরিষদ
তাকে দলে রেখে দিতে বাধ্য হয়। ২০০৩ সালের ১৬ নভেম্বর, পোর্তোর বিপক্ষে একটি প্রীতি
খেলায়র সময় ১৬ বছর এবং ১৪৫ দিন বয়সে দাপ্তরিক ভাবে বার্সেলোনায় মেসির অভিষেক হয়।
২০০৫ সালের ১ মে, আলবাকেতে বালোম্পাইয়ের বিপক্ষে বার্সেলোনার সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড়
হিসেবে লা লিগায় গোল করার রেকর্ড গড়েন মেসি।
বার্সেলেনায় মেসির যত রেকর্ড
লিওনেল
মেসির পেশাদার ফুটবল জীবনের পুরোটাই
কেটেছে বার্সেলোনায়। বার্সেলোনা মূল
দলের হয়ে মেসির অভিষেক ২০০৪ এর অক্টোবরে। তার দখলে আছে অজস্র সব রেকর্ড, যে
সংখ্যাগুলো অনেকের মনে হতে পারে অবিশ্বাস্য। বার্সেলোনা মূল দলের হয়ে ১৭ মৌসুম
খেলেছেন মেসি। ৭৭৮ ম্যাচে করেছেন ৬৭২ গোল, অ্যাসিস্ট ৩০৫টি। এক ক্লাবের হয়ে যা
সর্বোচ্চ গোলের বিশ্বরেকর্ড। বার্সেলোনার হয়ে তার ক্যারিয়ারে আছে ৪৮ হ্যাটট্রিক।
ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সের
পাশাপাশি মেসি, ক্লাবের হয়েও পেয়েছেন
অভুতপূর্ব সাফল্য। মেসির অর্জনের ঝুলিতে আছে ৩৪টি শিরোপা। লা লিগাই জিতেছেন ১০
বার। কোপা দেল রে শিরোপা জয়ের স্বাদ আছে ৭ বার। ৪টি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ছাড়াও মেসির
ট্রফি ক্যাবিনেটে আছে ৭টি স্প্যানিশ সুপার কাপ এবং ৩টি করে ইউয়েফা সুপার কাপ ও
ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপ।
লা লিগার ইতিহাসেও সবচেয়ে বেশি গোল-অ্যাসিস্টের মালিক লিওনেল মেসি। ক্রিস্টিয়ানো
রোনালদোর সঙ্গে তার দ্বৈরথ থাকলেও, দীর্ঘ সময় লা লিগায় খেলা মেসিরই দখলে অধিকাংশ
রেকর্ড। লা লিগার এক মৌসুমে সর্বোচ্চ গোল-অ্যাসিস্টের পাশেও আছে তার নাম। মেসির এক
পঞ্জিকাবর্ষে ৫৯ গোলের রেকর্ডটাও এখন পর্যন্ত অক্ষুন্ন।
২০০৫
সালের ১৬ সেপ্টেম্বর দ্বিতীয়বারের মত বার্সেলোনা মেসির সাথে তাদের চুক্তি নবায়ন করে।
এসময় মূল দলের খেলোয়াড় হিসেবে মেসির পারিশ্রমিক বাড়ানো হয় এবং চুক্তির মেয়াদ
বাড়িয়ে ২০১৪ সাল পর্যন্ত করা হয়। ২০০৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর, মেসিকে স্পেনের নাগরিকত্ব
প্রদান করা হয় এবং তিনি লা লিগায় খেলার সুযোগ পেয়ে যান।
মেসির পিএসজি-তে যোগদান
বার্সেলোনা ও লিওনেল মেসির ২১ বছরের সম্পর্কের বিচ্ছেদের মধ্যদিয়ে আর্জেন্টাইন
তারকার পিএসজিতে যোগ দেওয়ার যে জোরালো গুঞ্জন উঠেছিল, তা ১১ আগষ্ট ২০২১ বাস্তবে রূপ নিল। সম্পন্ন হলো ফরাসি ক্লাবটির সঙ্গে
রেকর্ড ছয়বারের ব্যালন ডি'অর জয়ী ফরোয়ার্ডের চুক্তির আনুষ্ঠানিকতা। আগামী ২০২৩ সাল পর্যন্ত পার্ক দে প্রিন্সেসের
দলটিতে থাকবেন সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলার। চুক্তির মেয়াদ আরও এক বছর বাড়ানোর সুযোগও
রাখা হয়েছে।
ভিন গ্রহের ফুটবলার মেসির অবিশ্বাস্য ২০ টি রেকর্ড
>এক সিজনে সবথেকে বেশি গোল (২০১১-১২ মৌসুমে করা ৭৩ গোল)
করা প্লেয়ার ।
>বিশ্বের সবথেকে জনপ্রিয় ফুটবল ম্যাচ এল ক্ল্যাসিকোতে
এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি ২৩ গোল করা ফুটবলার ।
> লা-লিগার ইতিহাসে সবথেকে বেশি
গোল করা ফুটবলার (৩৫০ এর বেশি গোল এবং সংখ্যাটি বাড়ছে প্রায় প্রতি খেলাতেই)
> এক লা-লিগা সিজনে সবথেকে বেশি
৫০ গোল করা একমাত্র ফুটবলার মেসি । (২০১১-১২ সিজনে)
> বার্সেলোনার
হয়ে সবথেকে বেশি গোল করার রেকর্ড (৫৩৮ গোল এবং তা বাড়ছেই) ।
> বার্সেলোনার হয়ে সবথেকে বেশি হ্যাট্রিক এর রেকর্ড । (৩৭ টি)
> বার্সেলোনার হয়ে সবথেকে বেশি ফ্রি কিকে গোল করার রেকর্ড । (২৭
টি)
> লা-লিগার ইতিহাসে সবথেকে বেশি অ্যাসিস্ট করা
প্লেয়ার (১৩৭ টি)।
> সবথেকে বেশি লা-লিগার প্লেয়ার অব
ডা সিজন হওয়ার রেকর্ড । (৬ বার)
> সবথেকে কম বয়সে ১০০ চ্যাম্পিয়ন্স লীগ ম্যাচ খেলার রেকর্ড (২৮ বৎসর
৮৪ দিন) ।
> আর্জেন্টিনার হয়ে সবথেকে বেশি গোল করা ফুটবলার এই মেসি দা
ম্যাজিশিয়ান । (৫৮ গোল)
> সাউথ আমেরিকান প্লায়েরদের মাঝে সবথেকে কম বয়সে ১০০
ইন্টারন্যাশনাল ম্যাচ খেলার রেকর্ড ( ২৭ বছর, ২৬১ দিন)
> মেসিই আর্জেন্টিনার একমাত্র প্লেয়ার যে কিনা অন্য
সব সাউথ আমেরিকান দলের বিরুদ্ধে গোল করেছে।
> কোপা আমেরিকার ইতিহাসে সবথেকে বেশি অ্যাসিস্ট করা ফুটবলার । (১১
টি অ্যাসিস্ট)
> ইতিহাসের একমাত্র ফুটবলার হিসেবে টানা ৮ সিজনে ৪০ বা তার বেশি গোল
করার রেকর্ড
> এক ক্যালেন্ডার ইয়ারে সবথেকে বেশি গোল করার রেকর্ড (৯১ টি ২০১২ সালে)
।
> ইউরোপের সেরা ৫ টি লীগের মাঝে সবচেয়ে কম সময়ে
৩০০ গোল এর মাইলস্টোনে পৌছার রেকর্ড ।
> সবচেয়ে কম সময়ে ১০০ ভিন্ন ভিন্ন ম্যাচ এ দুই বা তার অধিক গোল
করার রেকর্ড ।
> ইতিহাসের একমাত্র ফুটবলার যিনি কিনা ১০ টি ব্যালন ডিওর এ শেষ
তিনজন এর লিস্ট এর মধ্যে ছিলেন ।
আর্জেন্টিনার হয়ে মেসির যত অর্জন
বার্সেলোনা ক্লাব ফুটবলে মেসির অনেক গোলের ও ট্রফি অর্জনের রেকর্ড রয়েছে। তাইবলে দেশের হয়েও তার অর্জন মোটেও কম নয়। মেসি আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা। দেশের হয়ে তিনি ১৬৭ ম্যাচে ৯৩ গোল করেন। বয়সভিত্তিক পর্যায়ে তিনি আর্জেনটিনাকে ২০০৫ ফিফা ইয়ুথ চ্যাম্পিয়নশিপ জেতাতে সাহায্য করেন যে প্রতিযোগিতায় তিনি সর্বোচ্চ গোলদাতা এবং সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার অর্জন করেন।
এছাড়া তিনি ২০০৮
গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিকে আর্জেন্টিনার হয়ে ফুটবলে স্বর্ণপদক জয় করেন। মেসির
কল্যাণেই ব্রাজিলকে হারিয়ে ২৮ বছর পর কোন বড় আন্তর্জাতিক শিরোপা জিতলো
আর্জেন্টিনা। মেসি পেলেন প্রথম আন্তর্জাতিক শিরোপা। এখন আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে তার একটি অভাব আছে। সেটি
হল বিশ্বকাপ। এবারে কাতার বিশ্বকাপে অবশ্যই মেসি তার সেরাটা দিয়ে নিজের ক্যারিয়ারের
ইতি টানবেন এবং বিশ্বকাপের শিরোপা নিজের দখলে নিবেন এটাই আমাদের বিশ্বাস।


মন্তব্য